Wed. Feb 20th, 2019

খলিফা উসমান ইবন আফ্‌ফান এর জীবনী

পোস্ট শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
33 Views

উসমান ইব্‌ন আফফান (রাঃ) ইসলামের তৃতীয় খলিফা । তিনি মক্কার বিখ্যাত বানু উমায়্যা গোত্রে জন্মগ্রহণ করেন । তিনি এই বংশের আবুল আসীর পৌত্র ছিলেন । রাসূল (সঃ) এর নবুওয়ত লাভের প্রথম দিকেই হিজরাতের বেশ পূর্বে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন ।

উমায়্যাগন অনেক পরে ইসলাম গ্রহণ করিলেও ব্যক্তিগতভাবে হযরত উসমান (রাঃ) এই সৎ সাহসের জন্য প্রসিদ্ধি লাভ করেন । তিনি একজন ধনী ব্যবসায়ী ( সেহেতু তাহকে উসমান গনী বলা হইত) এবং সামাজিক খ্যাতি ও যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তি ছিলেন । তিনি সৌন্দর্য ও শালীনতার প্রতীক ছিলেন । রাসূল (সঃ) এর কন্যা রুকায়ার সহিত তাঁহার বিবাহ ইসলাম গ্রহণের পর সঙ্ঘটিত হয় এবং তিনি বিবাহের পর পত্নীসহ আবিসিনিয়ায় হিজরত করেন (শিবলী, সীরাতুন্নাবী ২খ, ৪২৬) । হযরত উসমান (রাঃ) আবিসিনিয়াতে মুসলিমগণের দুইটি হিজরাতেই অংশগ্রহণ করেন । তৎপর মদিনায় মুহাজিরগণের সহিত মিলিত হন। তাঁহার স্ত্রী পিড়িটা থাকায় তিনি বাঁদরের যুদ্ধে যোগদান করিতে পারেন নাই । হযরত রুকায়্যার (রাঃ) মৃত্যুর পর রাসূল (সঃ) হযরত উসমান (রাঃ) এর সহিত তাঁহার অপর এক কন্যা উম্মু কুলছুমের বিবাহ দেন । এই কারণে তাহাকে যুন-নুরাইন (দুই জ্যোতির অধিকারী) বলা হইত ।

হযরত উমার (রাঃ) ইন্তিকালের পূর্বে খলীফা নির্বাচনের উদ্দেশ্যে বিশিষ্ট যে ছয়জন সাহাবীর সমন্বয়ে একটি মাজলিস গঠন করিয়াছিলেন হযরত উসমান (রাঃ) ছিলেন তাহাদের অন্যতম । তাহারা সর্বসম্মতিক্রমে উসমান (রাঃ) কে খলীফা পদে মনোনীত করেন । হযরত উসমান (রাঃ) তাঁহার খিলাফাতকালে কুরআন ও সুন্নাহ্‌র নীতি অনুসরণ করেন ।

হযরত উসমান (রাঃ) এর খিলাফাতের সপ্তম বৎসরে মুসলিমদের প্রথম অন্তবিরোধ আরম্ভ হয় । এবং স্বয়ং খলীফা এই বিরোধ বহ্নিতে শাহাদাত বরন করেন । আরব ঐতিহাসিকগণ এই ব্যাপারে খলীফার বিরুদ্ধবাদীগণের অভিযোগসমূহ লিপিবদ্ধ করিয়াছেন (আত-তাবারীকৃত আর রিয়াদুন নাদিরাঃ ফী মানাকিবিল আশারাঃ , কায়রো ১৩২৭ হিঃ, ২খ ১৩৭-১৫২ পুস্তকে ইহার বিস্তারিত আলোচনা আছে )। তাঁহার বিরুদ্ধে প্রথম এবং প্রধান অভিযোগ ছিল এই যে, তিনি তাঁহার আত্মীয় স্বজনগণকে প্রাদেশিক শাসঙ্কর্তার পদে নিযুখ করিয়াছিলেন । বাস্তবিকপক্ষে এই শাসনকর্তাদের অধিকাংশই উয্রত উমার (রা;) এর সময়েই নিযুক্ত হইয়াছিলেন । হযরত উমার (রাঃ) এর সময়েই প্রাদেশিক শাসনকর্তাগণের স্বাতন্ত্র্য-প্রিয়তার জন্য তাহাদিগকে খলীফার ক্ষমতাধীনে রাখা ক্রমশ দুরূহ হইয়া উঠিতেছিল । কিন্তু হযরত উমার (রাঃ) তাঁহার ব্যক্তিত্ব প্রভাবে প্রাদেশিক শাসনকর্তাগনকেও আয়ত্তে রাখিতে সক্ষম হইয়াছিলেন । হজরত উসমানের নমনীয়তার সুযোগ লইয়া তাঁহার গোত্রীয় আত্মীয়-স্বজনগণ তাঁহার উপর প্রাধান্য বিস্তার করে । তাঁহার বিরুদ্ধে আর একটি অভিযোগ এই ছিল যে, তিনি বিজয়লব্ধ ধন-সম্পত্তির একাংশ তাঁহার আত্মীয় স্বজনকে দান করিয়াছিলেন । উসমানী খিলাফাতের পূর্বে যে মধ্যপ্রাচ্যের অমুসলিম দেশগুলির বিরুদ্ধে যে জিহাদ চলিতেছিল, তাহাতে যে ~মালু~ল গানীমা- পাওয়া যাইত তাহা সমস্ত সৈনিকের মধ্যে বণ্টন করিয়া দেওয়া হইত । ইহা হইতে কিছু কিছু অংশ বিশেষভাবে বিশিষ্ট ব্যক্তিগণকে দেওয়া হইত । হযরত উসমান (রাঃ) জনগনের সম্পদ হইতে অন্যায়ভাবে কাহাকেও কিছু দেন নাই । ব্যক্তিগত সম্পদ হইতে অনেক সময় আত্মীয় স্বজনকেও দান করিতেন । হযরত উসমান (রাঃ) হযরত আবু বকর (রাঃ) সংগৃহীত কুরআন মজিদের প্রামাণ্য অনুলিপি প্রস্তুত করাইয়া প্রাদেশিক শাসনকর্তাগণের নিকট পাঠাইয়া দেন এবং আঞ্চলিক পাঠ বৈষম্যযুক্ত অনুলিপিগুলি জ্বালাইয়া ফেলিতে আদেশ দেন । হযরত উসমান (রাঃ) এর এই কার্যের উদ্দেশ্য ছিল যে, বিস্তীর্ন মুসলিম খিলাফাতে প্রচলিত আরবী বাক-রীতির অনুপ্রবেশে যেন কুরআনে পাঠ-বৈষম্যের সৃষ্টি না হয় । অথচ ইহাকেও তাঁহার বিরুদ্ধবাদীরা আন্দোলনের হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করে ।

হযরত উসমান (রাঃ) এর সময়ে অশান্তির ঘটনা প্রবাহের সংক্ষিপ্ত বিবরণ এইরূপঃ

হযরত উসমান (রাঃ) এর দ্বাদশ বর্ষব্যাপী খিলাফাতকাল দুই অংশে বিভক্ত । প্রথম ছয় বৎসরে (২৩-২৯) শান্তি বিরাজ করে এবং শেষ ছয় বৎসর (৩০-৩৫) অশান্তির কাল । এই বিদ্রোহ ও ষড়যন্ত্রের কেন্দ্র ছিল মিসর । সেই সমুদয় ইহুদী যাহারা শুধু মৌখিকভাবে লোক দেখানোর জন্য ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিল । এই ষড়যন্ত্রকারী দলের নেতা ছিল মুসলমান ছদ্মবেশী ইহুদী সন্তান আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা । সানআর অধিবাসী আব্দুল্লাহ ইব্‌ন সাবা ইসলাম গ্রহণের কিছুকাল পর মদিনায় আসিয়া বসবাস আরম্ভ করিল । হযরত আলী (রাঃ) এর নাম নিয়া হযরত উসমান (রাঃ) এর বিরুদ্ধে মুসলমানদিগকে উসকাইতে লাগিল । ইহার পর সে বসরায় গিয়া একই প্রক্রিয়ায় উসমান (রাঃ) এর বিরুদ্ধে জনসাধারণকে উত্তেজিত করিতে লাগিল । তারপর কুফা ও দামেস্কে গিয়া একই কাজ করিতে লাগিল । অবশেষে মিসরে পৌঁছাইয়া জনসাধারণকে এত উত্তেজিত করিয়া তুলিল যে, তাঁহারা উসমান (রাঃ) কে নিহত করাকেই জাতির স্বার্থে সর্ববৃহৎ কর্ম বলিয়া মনে করিতে লাগিল । কিছুকাল যাবত এইরূপ দুর্যোগের যে মেঘ পুঞ্জীভূত হইতেছিল ৩৫ হিঃ এর শেষে তাঁহার বইঃপ্রকাশ ঘটিল । বিভিন্ন প্রদেশের বিদ্রোহীগণ মদিনার দিকে যাত্রা করে । সর্বপ্রথম আসে মিসরীয়গণ । খলীফার সহিত সাক্ষাতে তাঁহার তাহাদের অভিযোগসমূহ অতিশয় তীব্র ভাষায় প্রকাশ করে । কিন্তু খলীফার নম্র এবং শান্ত ব্যবহারে তাঁহার প্রশমিত হয় । খলীফা তাহাদিগের সমস্ত দাবী মানিয়া লন ।

কিন্তু পথিমধ্যে আল-আরীশ নামক স্থানে হযরত উসমান (রাঃ) এর এক দূত ধরা পড়ে এবং তাঁহার নিকট একটি পত্র পাওয়া যায় । ইহা মিসরের গভর্নর আব্দুল্লাহ ইবনে সা~দের নিকট লিখিত ছিল । পত্রে আন্দোলনের এই নেতৃবৃন্দকে দেশে প্রত্যাবর্তনের পর মৃত্যুদণ্ড দিতে কিংবা অঙ্গচ্ছেদ করিতে বলা হইয়াছিল । এই পত্র হস্তগত হওয়ায় ফলে বিদ্রোহীগণ ক্রোধান্বিত হইয়া প্রতিশোধ গ্রহণের উদ্দেশ্যে মদিনায় ফিরিয়া আসে ।

হযরত উসমান (রাঃ) এই পত্র তাঁহার লিখিত বলিয়া অস্বীকার করেন এবং ইহা তাঁহার শতুগনের দুরভিসন্ধিমূলক কার্য বলিয়া অনুমান করেন । অবশেষে লেখার পদ্ধতিতে ধরা পড়িল যে, ইহা মারওয়ানের লেখা । হযরত আলী (রাঃ) ও অপরাপর সাহাবাগন আপ্রাণ চেষ্টা করিলেন যাহাতে বিদ্রোহীগণ মদীনা ত্যাগ করিয়া চলিয়া যায় । বিদ্রোহীগণ বুঝিতে পারিল যে চিঠি সত্যই উসমানের (রাঃ) লেখা নয় । তথাপিও তাহারা উসমান (রাঃ) এর খিলাফাত ত্যাগের জন্য আন্দোলন চালাইয়া গেল । বিদ্রোহীগণ হযরত উসমান (রাঃ) কে গৃহে অবরুদ্ধ করিয়া রাখে । হযরত উসমান (রাঃ) বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে সাহাবীগণকে নিষেধ করেন । কিন্তু তাহাদের কেহ কেহ আপন পুত্রগণকে হযরত উসমান (রাঃ) এর গৃহদ্বারে প্রহরী নিযুক্ত করেন । হযরত আইশা (রাঃ) এই সময়ে মক্কায় হাজ্জ করিতে গিয়াছিলেন । হযরত উসমান (রাঃ) নিজ মর্যাদায় অবিচলিত থাকিয়া ঘোষণা করিয়া দিলেন যে, তিনি কোন অবস্থাতেই খিলফাত ত্যাগ করিবেন না । কয়েকদিন এইরূপ অবরোধের পর কতিপয় ব্যক্তি ৩৫ হিঃ (জুন ৬৫৬) মুহাম্মদ ইব্‌ন আবী বকরের নেতৃত্বে খলিফার গৃহাভ্যন্তএর প্রবেশ করিয়া তাহাকে আক্রমণ করে । খলিফা এই সময় কুরআন পাঠ করিতেছিলেন । তাঁহার রক্ত কুরআনের উপর ছিটকাইয়া পড়ে । তাঁহার কাল্‌ব গোত্রীয়া স্ত্রী নাইলা বিন্‌ত ফুরাফিসা আহত হন । খলীফার শাহাদাতের পর রাত্রে অতি গোপনীয়তার সহিত তাঁহার মৃতদেহ কয়েকজন আত্মীয় দাফন করেন । মু~আবিয়া (রাঃ) সিরিয়া হইতে খলীফাকে সাহায্য করিবার মানসে একদল সৈন্য প্রেরণ করিয়াছিলেন । পথে খলফার নিহত হওয়ার সংবাদ পাইয়া আবার তাঁহার সিরিয়ায় ফিরিয়া যায় ।

এই হত্যাকাণ্ডের ফলে ইসলামের রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় একতা নষ্ট হইয়া যায় এবং ধর্মীয় মতবিরোধ ও গৃহযুদ্ধের যুগ আরম্ব হয় । হযরত উসমান (রাঃ) এর খিলাফাত এবং ইহার রক্তাক্ত সমাপ্তি ইসলামের ইতিহাসে একটি করুন ও যুগান্তকারী ঘটনা ।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, হযরত উসমান (রাঃ) অত্যাধিক নির্মল চরিত্রসম্পন্ন ছিলেন এবং সরলপ্রাণ ব্যক্তি ছিলেন । নম্রতা, ধর্মপ্রানতা ইত্যাদি গুণাবলী তাঁহার চরিত্রের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল । কোরআন সঙ্কলনের বিশেষ অবদানের জন্য তাহাকে জা~মেউল কোরআন উপাধি দেয়া হয় । হাদিসে আছে রাসুলুল্লাহ (সঃ) বলিয়াছেন ~ বেহেশতে প্রত্যেক নবীরই সঙ্গী থাকিবে । আমার সঙ্গী হইবে উসমান ।——-*****——–

ওমর (রাঃ)-এর শাহাদত ও উসমান (রাঃ)-এর খলীফা মনোনয়ন

ইসলামের দ্বিতীয় খলীফা ওমর (রাঃ) চরমপন্থীদের হাতে ছালাতরত অবস্থায় ছুরিকাহত হন। অতঃপর তিনি পরবর্তী খলীফা মনোনয়নের জন্য ৭ সদস্যের পরিষদ গঠন করে দিয়ে যান। ঐ পরিষদ ওছমান (রাঃ)-কে খলীফা মনোনীত করেন। এরপর ওছমান (রাঃ) খিলাফতের বায়‘আত গ্রহণ করেন। এ সম্পর্কে নিম্নোক্ত হাদীছ।-

আমর ইবনু মায়মূন (রহঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ)-কে আহত হবার কিছু দিন পূর্বে মদীনায় দেখেছি যে, তিনি হুযায়ফাহ ইবনু ইয়ামান (রাঃ) ও ওছমান ইবনু হুনায়ফ (রহঃ)-এর নিকট দাঁড়িয়ে তাঁদেরকে লক্ষ্য করে বলছেন, তোমরা এটা কী করলে? তোমরা এটা কী করলে? তোমরা কি আশঙ্কা করছ যে, তোমরা ইরাক ভূমির উপর যে কর ধার্য করেছ তা বহনে ঐ ভূ-খন্ড অক্ষম? তারা বললেন, আমরা যে পরিমাণ কর ধার্য করেছি, ঐ ভূ-খন্ড তা বহনে সক্ষম। এতে বাড়তি কোন বোঝা চাপানো হয়নি। তখন ওমর (রাঃ) বললেন, তোমরা আবার চিন্তা করে দেখ যে, তোমরা এ ভূ-খন্ডের উপর যে কর আরোপ করেছ তা বহনে সক্ষম নয়? বর্ণনাকারী বলেন, তাঁরা বললেন, না। অতঃপর ওমর (রাঃ) বললেন, আল্লাহ যদি আমাকে সুস্থ রাখেন তবে ইরাকের বিধবাগণকে এমন অবস্থায় রেখে যাব যাতে তারা আমার পরে কখনো অন্য কারো মুখাপেক্ষী না হয়। বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর চতুর্থ দিন তিনি আহত হ’লেন। যেদিন ভোরে তিনি আহত হন, আমি তাঁর কাছে দাঁড়িয়েছিলাম এবং তাঁর ও আমার মাঝে আব্দুল্লাহ ইবনু আববাস (রাঃ) ছাড়া অন্য কেউ ছিল না। ওমর (রাঃ) দু’কাতারের মধ্য দিয়ে চলার সময় বলতেন, কাতার সোজা করে নাও। যখন দেখতেন কাতারে কোন ত্রুটি নেই তখন তাকবীর বলতেন। তিনি অধিকাংশ সময় সূরা ইউসুফ, সূরা নাহল অথবা এ ধরনের সূরা প্রথম রাক‘আতে তিলাওয়াত করতেন, যেন অধিক পরিমাণে লোক প্রথম রাক‘আতে শরীক হ’তে পারেন। তাকবীর বলার পরেই আমি তাঁকে বলতে শুনলাম, একটি কুকুর আমাকে আঘাত করেছে অথবা বলেন, আমাকে আক্রমণ করেছে। ঘাতক ‘ইলজ’ দ্রুত পলায়নের সময় দু’ধারী খঞ্জর দিয়ে ডানে বামে আঘাত করে চলছে। এভাবে সে তের জনকে আহত করল। এদের মধ্যে সাত জন শহীদ হ’লেন। এ অবস্থা দেখে এক মুসলিম তার লম্বা চাদরটি ঘাতকের উপর ফেলে দিলেন। ঘাতক যখন বুঝতে পারল যে, সে ধরা পড়ে যাবে তখন সে আত্মহত্যা করল।

ওমর (রাঃ) আব্দুর রহমান ইবনু আউফ (রাঃ)-এর হাত ধরে সামনে এগিয়ে দিলেন। ওমর (রাঃ)-এর নিকটে যারা ছিল শুধুমাত্র তারাই ব্যাপারটি দেখতে পেল। আর মসজিদের শেষে যারা ছিল তারা ব্যাপারটি এর অধিক বুঝতে পারল না যে, ওমর (রাঃ)-এর কণ্ঠস্বর শুনা যাচ্ছে না। তাই তারা ‘সুবহানাল্লাহ, সুবহানাল্লাহ’ বলতে লাগল। আব্দুর রহমান ইবনু আউফ (রাঃ) তাঁদেরকে নিয়ে সংক্ষেপে ছালাত আদায় করলেন। যখন মুছল্লীগণ চলে গেলেন, তখন ওমর (রাঃ) বললেন, হে ইবনু আববাস (রাঃ)! দেখ তো কে আমাকে আঘাত করল। তিনি কিছুক্ষণ অনুসন্ধান করে এসে বললেন, মুগীরাহ ইবনু শু‘বাহ (রাঃ)-এর গোলাম (আবূ লুলু)। ওমর (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেন, ঐ কারিগর গোলামটি? তিনি বললেন, হ্যাঁ। ওমর (রাঃ) বললেন, আল্লাহ তার সর্বনাশ করুন। আমি তার সম্পর্কে সঠিক সিদ্ধান্ত দিয়েছিলাম। আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ আমার মৃত্যু ইসলামের দাবীদার কোন ব্যক্তির হাতে ঘটাননি। হে ইবনু আববাস (রাঃ)! তুমি এবং তোমার পিতা মদীনার কাফির গোলামের সংখ্যা বৃদ্ধি পসন্দ করতে। আববাস (রাঃ)-এর নিকট অনেক অমুসলিম গোলাম ছিল। ইবনু আববাস (রাঃ) বললেন, যদি আপনি চান তবে আমি কাজ করে ফেলি অর্থাৎ আমি তাদেরকে হত্যা করে ফেলি। ওমর (রাঃ) বললেন, তুমি ভুল বলছ। কেননা তারা তোমাদের ভাষায় কথা বলে, তোমাদের কিবলামুখী হয়ে ছালাত আদায় করে, তোমাদের মত হজ্জ করে।

অতঃপর তাঁকে তাঁর ঘরে নেয়া হ’ল। আমরা তাঁর সঙ্গে চললাম। মানুষের অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছিল, ইতিপূর্বে তাদের উপর এত বড় মুছীবত আর আসেনি। কেউ কেউ বলছিলেন, ভয়ের কিছু নেই। আবার কেউ বলছিলেন, আমি তাঁর সম্পর্কে আশংকাবোধ করছি। অতঃপর খেজুরের শরবত আনা হ’ল, তিনি তা পান করলেন। কিন্তু তা তাঁর পেট হ’তে বেরিয়ে পড়ল। অতঃপর দুধ আনা হ’ল, তিনি তা পান করলেন; তাও তাঁর পেট হ’তে বেরিয়ে পড়ল। তখন সকলেই বুঝতে পারলেন, তাঁর মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। আমরা তাঁর নিকট উপস্থিত হ’লাম। অন্যান্য লোকজনও আসতে শুরু করল। সকলেই তাঁর প্রশংসা করতে লাগল। তখন যুবক বয়সী একটি লোক এসে বলল, হে আমীরুল মুমিনীন! আপনার জন্য আল্লাহ্র সু-সংবাদ রয়েছে; আপনি তা গ্রহণ করুন। আপনি নবী করীম (ছাঃ)-এর সাহচর্য গ্রহণ করেছেন, ইসলামের প্রাথমিক যুগেই আপনি তা গ্রহণ করেছেন, যে সম্পর্কে আপনি নিজেই অবগত আছেন। অতঃপর আপনি খলীফা হয়ে ন্যায়বিচার করেছেন। অতঃপর আপনি শাহাদত লাভ করছেন। ওমর (রাঃ) বললেন, আমি পসন্দ করি যে তা আমার জন্য ক্ষতিকর বা লাভজনক না হয়ে সমান সমান হয়ে যাক। যখন যুবকটি চলে যেতে উদ্যত হ’ল তখন তার লুঙ্গিটি মাটি ছুঁয়ে যাচ্ছিল। ওমর (রাঃ) বললেন, যুবকটিকে আমার নিকট ডেকে আন। তিনি বললেন, হে ভাতিজা! তোমার কাপড়টি উঠিয়ে নাও। এটা তোমার কাপড়ের পরিচ্ছন্নতার জন্য এবং তোমার রবের নিকটও পছন্দনীয়।

হে আব্দুল্লাহ ইবনু ওমর! তুমি হিসাব করে দেখ আমার ঋণের পরিমাণ কত? তারা হিসাব করে দেখতে পেলেন ছিয়াশি হাযার (দিরহাম) বা এর কাছাকাছি। তিনি বললেন, যদি ওমরের পরিবার-পরিজনের মাল দ্বারা তা পরিশোধ হয়ে যায়, তবে তা দিয়ে পরিশোধ করে দাও। অন্যথা আদি ইবনু কা‘ব-এর বংশধরদের নিকট হ’তে সাহায্য গ্রহণ কর। তাদের মাল দিয়েও যদি ঋণ পরিশোধ না হয় তবে কুরাইশ কবীলা হ’তে সাহায্য গ্রহণ করবে, এর বাইরে কারো সাহায্য গ্রহণ করবে না। আমার পক্ষ হ’তে তাড়াতাড়ি ঋণ আদায় করে দাও। উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রাঃ)-এর খিদমতে তুমি যাও এবং বল, ওমর আপনাকে সালাম পাঠিয়েছেন। আমীরুল মুমিনীন শব্দটি বলবে না। কেননা এখন আমি মুমিনগণের আমীর নই। তাঁকে বল, ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব তাঁর সাথীদ্বয়ের পাশে দাফন হবার অনুমতি চাচ্ছেন।

ইবনু ওমর (রাঃ) আয়েশা (রাঃ)-এর খিদমতে গিয়ে সালাম জানিয়ে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। তিনি বললেন, প্রবেশ কর। তিনি দেখলেন আয়েশা (রাঃ) বসে বসে কাঁদছেন। তিনি গিয়ে বললেন, ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ) আপনাকে সালাম পাঠিয়েছেন এবং তাঁর সঙ্গীদ্বয়ের পার্শ্বে দাফন হবার জন্য আপনার অনুমতি চেয়েছেন। আয়েশা (রাঃ) বললেন, তা আমার আকাঙ্ক্ষা ছিল। কিন্তু আজ আমি এ ব্যাপারে আমার উপরে তাঁকে অগ্রগণ্য করছি। আব্দুল্লাহ ইবনু ওমর (রাঃ) যখন ফিরে আসছেন তখন বলা হ’ল, এই যে আব্দুল্লাহ ফিরে আসছে। তিনি বললেন, আমাকে উঠিয়ে বসাও। তখন এক ব্যক্তি তাকে ঠেস দিয়ে বসিয়ে ধরে রাখলেন। ওমর (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেন, কী সংবাদ? তিনি বললেন, আমীরুল মুমিনীন, আপনি যা কামনা করেছেন, তাই হয়েছে, তিনি অনুমতি দিয়েছেন। ওমর (রাঃ) বললেন, আলহামদুলিল্লাহ। এর চেয়ে বড় কোন বিষয় আমার নিকট ছিল না। যখন আমার মৃত্যু হয়ে যাবে তখন আমাকে উঠিয়ে নিয়ে, তাঁকে আমার সালাম জানিয়ে বলবে, ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ) আপনার অনুমতি চাচ্ছেন। যদি তিনি অনুমতি দেন, তবে আমাকে প্রবেশ করাবে আর যদি তিনি অনুমতি না দেন তবে আমাকে সাধারণ মুসলিমদের গোরস্থানে নিয়ে যাবে। এ সময় উম্মুল মুমিনীন হাফছাহ (রাঃ)-কে কতিপয় মহিলাসহ আসতে দেখে আমরা উঠে পড়লাম। হাফছাহ (রাঃ) তাঁর নিকট গিয়ে কিছুক্ষণ কাঁদলেন। অতঃপর পুরুষরা এসে প্রবেশের অনুমতি চাইলে তিনি ঘরের ভিতরে গেলেন। ঘরের ভিতর হ’তেও আমরা তাঁর কান্নার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলাম। তাঁরা বললেন, হে আমীরুল মুমিনীন! আপনি ওছিয়ত করুন এবং খলীফা মনোনীত করুন। ওমর (রাঃ) বললেন, খিলাফতের জন্য এ কয়েকজন ছাড়া অন্য কাউকে আমি যোগ্যতম পাচ্ছি না, যাঁদের প্রতি নবী করীম (ছাঃ) তাঁর ইন্তিকালের সময় রাযী ও খুশী ছিলেন। অতঃপর তিনি তাঁদের নাম বললেন, আলী, ওছমান, যুবায়ের, ত্বালহা, সা‘দ ও আব্দুর রহমান ইবনু আঊফ (রাঃ)। অতঃপর বললেন, আব্দুল্লাহ ইবনু ওমর (রাঃ) তোমাদের সঙ্গে থাকবে। কিন্তু সে খিলাফত লাভ করতে পারবে না। তা ছিল শুধু সান্ত্বনা মাত্র। যদি খিলাফতের দায়িত্ব সা‘দ (রাঃ)-এর উপর ন্যস্ত করা হয় তবে তিনি এর জন্য যোগ্যতম ব্যক্তি। আর যদি তোমাদের মধ্যে অন্য কেউ খলীফা নির্বাচিত হন, তবে তিনি যেন সর্ব বিষয়ে সা‘দের সাহায্য ও পরামর্শ গ্রহণ করেন। আমি তাঁকে অযোগ্যতা বা খিয়ানতের কারণে অপসারণ করিনি। আমার পরের খলীফাকে আমি ওছিয়ত করছি, তিনি যেন প্রথম যুগের মুহাজিরগণের হক সম্পর্কে সচেতন থাকেন, তাদের মান-সম্মান রক্ষায় সচেষ্ট থাকেন। আমি তাঁকে আনছার ছাহাবীগণের যাঁরা মুহাজিরগণের আসার আগে এই নগরীতে (মদীনায়) বসবাস করে আসছিলেন এবং ঈমান এনেছেন, তাঁদের প্রতি সদ্ব্যবহার করার ওছিয়ত করছি যে, তাঁদের মধ্যে নেককারগণের ওযর-আপত্তি যেন গ্রহণ করা হয় এবং তাঁদের মধ্যে কারোর ভুল-ত্রুটি হ’লে তা যেন ক্ষমা করে দেয়া হয়। আমি তাঁকে এ ওছিয়তও করছি যে, তিনি যেন রাজ্যের বিভিন্ন শহরের অধিবাসীদের প্রতি সদ্ব্যবহার করেন। কেননা তাঁরাও ইসলামের হিফাযতকারী এবং তারাই ধন-সম্পদের যোগানদাতা। তারাই শত্রুদের চোখের কাঁটা। তাদের হ’তে তাদের সন্তুষ্টির ভিত্তিতে কেবলমাত্র তাদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ যেন যাকাত আদায় করা হয়। আমি তাঁকে পল্লীবাসীদের প্রতি সদ্ব্যবহার করারও ওছিয়ত করছি। কেননা তারাই আরবের ভিত্তি এবং ইসলামের মূল শক্তি। তাদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ এনে তাদের দরিদ্রদের মধ্যে যেন বিলিয়ে দেয়া হয়। আমি তাঁকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ছাঃ)-এর যিম্মীদের বিষয়ে ওছিয়ত করছি যে, তাদের সঙ্গে কৃত অঙ্গীকার যেন পুরা করা হয়। তাদের পক্ষাবলম্বনে যেন যুদ্ধ করা হয়, তাদের শক্তি-সামর্থ্যের অধিক জিযিয়া যেন চাপানো না হয়।

(রাবী বলেন) ওমর (রাঃ)-এর ইন্তিকাল হয়ে গেলে আমরা তাঁর লাশ নিয়ে পায়ে হেঁটে চললাম। আব্দুল্লাহ ইবনু ওমর (রাঃ) আয়েশা (রাঃ)-কে সালাম করলেন এবং বললেন, ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ) অনুমতি চাচ্ছেন। আয়েশা (রাঃ) বললেন, তাঁকে প্রবেশ করাও। অতঃপর তাঁকে প্রবেশ করান হ’ল এবং তাঁর সঙ্গীদ্বয়ের পার্শ্বে দাফন করা হ’ল। যখন তাঁর দাফন কাজ শেষ হ’ল, তখন ঐ ব্যক্তিবর্গ একত্রিত হ’লেন। এ সময় আব্দুর রহমান (রাঃ) বললেন, তোমরা তোমাদের বিষয়টি তোমাদের মধ্য হ’তে তিনজনের উপর ছেড়ে দাও। তখন যুবায়ের (রাঃ) বললেন, আমি আমার বিষয়টি আলী (রাঃ)-এর উপর অর্পণ করলাম। ত্বালহা (রাঃ) বললেন, আমার বিষয়টি ওছমান (রাঃ)-এর উপর ন্যস্ত করলাম। সা‘দ (রাঃ) বললেন, আমার বিষয়টি আব্দুর রহমান ইবনু আউফ (রাঃ)-এর উপর ন্যস্ত করলাম। অতঃপর আব্দুর রহমান (রাঃ) ওছমান ও আলী (রাঃ)-কে বললেন, আপনাদের দু’জনের মধ্য হ’তে কে এই দায়িত্ব হ’তে অব্যাহতি পেতে ইচ্ছা করেন? এ দায়িত্ব অপর জনের উপর অর্পণ করব। আল্লাহ ও ইসলামের হক আদায় করা তাঁর অন্যতম দায়িত্ব হবে। কে অধিকতর যোগ্য সে সম্পর্কে দু’জনেরই চিন্তা করা উচিত। ব্যক্তিদ্বয় চুপ থাকলেন। তখন আব্দুর রহমান (রাঃ) নিজেই বললেন, আপনারা এ দায়িত্ব আমার উপর ন্যস্ত করতে পারেন কি? আল্লাহকে সাক্ষী রেখে বলছি, আমি আপনাদের মধ্যকার যোগ্যতম ব্যক্তিকে নির্বাচিত করতে একটুও ত্রুটি করব না। তাঁরা উভয়ে বললেন, হ্যাঁ। তাদের একজনের হাত ধরে বললেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সঙ্গে আপনার যে ঘনিষ্ঠ আত্মীয়তা এবং ইসলাম গ্রহণের অগ্রগামিতা আছে তা আপনিও ভালভাবে জানেন। আল্লাহ্র ওয়াস্তে এটা আপনার জন্য যরূরী হবে যে, যদি আপনাকে খলীফা মনোনীত করি তাহ’লে আপনি ইনছাফ প্রতিষ্ঠা করবেন। আর যদি ওছমান (রাঃ)-কে মনোনীত করি তবে আপনি তাঁর কথা শুনবেন এবং তাঁর প্রতি অনুগত থাকবেন। অতঃপর তিনি অপর জনের সঙ্গে একান্তে অনুরূপ কথা বললেন। এভাবে অঙ্গীকার গ্রহণ করে তিনি বললেন, হে ওছমান (রাঃ)! আপনার হাত বাড়িয়ে দিন। তিনি (আব্দুর রহমান (রাঃ)-এর) তাঁর হাতে বায়‘আত করলেন। অতঃপর আলী (রাঃ) তাঁর (ওছমান (রাঃ)-এর নিকট) বায়‘আত করলেন। অতঃপর মদীনাবাসীগণ এগিয়ে এসে সকলেই বায়‘আত করলেন (বুখারী হা/৩৭০০)।

আলোচ্য হাদীছে ওমর (রাঃ)-এর বদান্যতার প্রমাণ রয়েছে। এতে আয়েশা (রাঃ)-এর প্রতি ওমর (রাঃ)-এর সম্মান করার বিষয়টিও ফুটে উঠেছে। সাথে সাথে নেতা মনোনয়নের ব্যাপারেও রয়েছে দিক নির্দেশনা। এ হাদীছটিতে মুমিনদের রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। এ হাদীছ থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের পার্থিব জীবনকে ঢেলে সাজাতে হবে। আল্লাহ আমাদের তাওফীক্ব দান করুন- আমীন!

সাতশো গুণ লাভ

হযরত আবু বকর(রা) এর খেলাফতকালে এক দুর্ভিক্ষ সংঘটিত হয়। খাদ্যদ্রব্য একেবারেই দুর্লভ হয়ে পড়ে এবং মানুষের দুঃখ দুর্দশা চরম আকার ধারণ করে। সেই সময় হযরত উসমানের প্রায় এক হাজার মন গমের একটি চালান বিদেশ হতে মদীনায় পৌঁছলো। শহরের কয়েকজন ব্যবসায়ী তাঁর কাছে এল। তারা তাঁর সমস্ত গমের চালান ৫০% লাভে কিনে নেয়ার প্রস্তাব দিল। সেই সাথে তারা এও ওয়াদা করল যে, তারা দুর্ভিক্ষ পীড়িত জনগণের দুর্দশা লাঘবের জন্যই এটা কিনতে চেয়েছে।

হযরত ওসমান(রা) বললেন, “তোমরা যদি আমাকে এক হাজার গুণ লাভ দিতে পার, তবে আমি দিতে পারি। কেননা অন্য একজন আমাকে সাতশো গুণ লাভ দিতে চেয়েছেন।”

ব্যবসায়ীরা বললো, “বলেন কি? চালান মদীনায় আসার পর তো আমরাই প্রথম এলাম আপনার কাছে। সাতশো গুণ লাভের প্রস্তাব কে কখন দিলো?”

হযরত ওসমান বললেন, “এই প্রস্তাব আমি পেয়েছি আল্লাহর কাছ থেকে। আমি এই চালানের সমস্ত গম বিনামূল্যে গরীবদের মধ্যে বিতরণ করবো। এর বিনিময়ে আল্লাহ আমাকে সাতশো গুণ বেশি পূণ্য দিবেন বলে ওয়াদা করেছেন।”

শিক্ষাঃ

পবিত্র কুরআনের সূরা বাকারার ২৬১ নং আয়াতে এই ওয়াদার উল্লেখ রয়েছে। হযরত ওসমান(রা) সম্ভবত ঐদিকেই ইঙ্গিত করেছেন। হযরত ওসমানের মহানুভবতার এই ঘটনা বিপন্ন মানুষের সেবাকে ইসলাম কত গুরুত্ব দেয়, তারই প্রমাণ বহন করে। জনসেবা ও ত্যাগের এই মনোভাব বিশেষভাবে ধনীদের মধ্যে সঞ্চারিত হওয়া খুবই জরুরী।——-*****——–

হযরত উসমানের দানশীলতা ও মিতব্যয়িতা

একদিন এক নিঃস্ব লোক রাসূলের নিকট এসে কিছু সাহায্য চাইল। তখন রাসূলের নিকট কিছুই ছিল না। তিনি লোকটাকে হযরত উসমানের নিকট পাঠালেন। দরিদ্র ব্যক্তিটি হযরত উসমানের গৃহে উপস্থিত হয়ে দেখে যে একদল পিঁপড়ে বেশ কিছু শস্য একটি স্তূপ থেকে গর্তে নিয়ে যাচ্ছে। হযরত উসমান শস্যগুলো একত্রিত করে কিছু শস্য পিঁপড়ের গর্তের কাছে ছড়িয়ে বাকীগুলি আবার স্তূপে রেখে দিচ্ছিলেন।

লোকটি ধারণা করলো যে হযরত উসমান বড় কৃপণ। সে মনে মনে ভাবলো যে দরিদ্র হওয়া সত্ত্বেও সে নিজে পিঁপড়ের মুখ হতে শস্য কেড়ে নিতো না। তাই কিছুই না চেয়ে লোকটি চলে গেল।

পরদিন লোকটি আবার রাসূলের নিকট উপস্থিত হল এবং কিছু চাইল। সে রাসূলকে জানাল যে, কৃপণ উসমানের (রা) নিকট কিছুই আশা করা যায় না, তাই সে কিছুই চায় নি। রাসূল (সা) তাকে আবার হযরত উসমানের নিকট পাঠালেন। অনিচ্ছা সত্ত্বেও গেল এবং দেখতে পেল যে হযরত উসমান (রা) তাঁর চাকরকে বাতির সলতে উঁচু করে দেয়ার দায়ে বকাঝকা করছেন।

কারণ তাতে অধিক তেল খরচ হয়। দরিদ্র লোকটি মনে মনে ভাবলো যে তার বাড়িতে আলো আরো উজ্জ্বল হয়ে জ্বলে এবং সে কখনও এরূপ তেলের হিসাব করে না। হযরত উসমানের কৃপণতা সম্বন্ধে তার ধারণা আরো জোরদার হলো। কিছু না চেয়েই সে আবার রাসূল (সা) এর নিকট ফিরে গেল। হযরত উসমানের বিরুদ্ধে কৃপণতার অভিযোগ শুনে রাসূল (সা) মৃদু হাসলেন এবং লোকটিকে আবার বললেন হযরত উসমানের কাছে ফিরে যেতে এবং কিছু চাইতে।

তৃতীয়বার লোকটি হযরত উসমানের নিকট এসে দেখে যে হযরত উসমানের বাড়ীতে তুলা শুকাতে দেয়া হয়েছে। ঢেকে দেয়া হয়েছে জাল দিয়ে। জালের নিচ হতে কিছু তুলা উড়ে উড়ে যাচ্ছিল। হযরত উসমান সেগুলিকে ধরে আবার জালের নিচে রাখছেন। লোকটির মন অত্যন্ত বিরূপ হয়ে উঠলো। ভাবলো এমন কৃপণও কি কিছু দান করতে পারে? তবুও যেহেতু রাসূল তাকে তিনবার উসমান (রা) এর কাছে পাঠিয়েছেন, তাই সে গিয়ে কিছু চাইলো।

হযরত উসমান ভাবলেন, লোকটিকে কি দেওয়া যায়, যে লোককে রাসূল (সা) তার নিকট সাহায্যের জন্য পাঠিয়েছেন, তার চাইতে সাহায্য নেওয়ার যোগ্য আর কে হতে পারে?

তখন দেখা গেল বেশ দূরে একটি সরু রেখা। রেখাটিকে একটি উটের কাফেলা বলেই মনে হলো। কিছুক্ষণ পর হযরত উসমান বুঝতে পারলেন, যে কাফেলা বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে সিরিয়ায় গিয়েছিল সেটিই ফিরে আসছে। হযরত উসমান তাকে লিখে দিলেন যে ঐ কাফেলার সবচেয়ে ভাল উটটি এবং যার উপর সবচেয়ে বেশি দ্রব্যসম্ভার আছে সেটিই সে নিতে পারে। লোকটি প্রথম মনে করলো যে হযরত উসমান তামাসা করছেন। কিছুক্ষণ কথাবার্তার পরও লোকটি তার দান সম্পর্কে নিঃসন্দেহ হতে পারলো না।

সন্দিগ্ধ চিত্তে সে গেল কাফেলার নিকট। সবচেয়ে ভালো এবং প্রথম উটটিই তার পছন্দ হলো। সেটি সে নিতে চাইল। কাফেলার পরিচালক অনুমতি দিল। কিন্তু মরুভূমিতে চলাকালে প্রথম উটটিকে কাফেলা হতে সরিয়ে নেয়া সহজ নয়। সবগুলো উটই প্রথমটিকে অনুসরণ করল। কাফেলার পরিচালক তখন লোকটিকে বললো যে আস্তানায় ফিরে যাওয়ার পর উটটি দেয়া হবে। হযরত উসমানের নিকট খবর দেয়া হল যে, একটি উটকে কাফেলা হতে সরিয়ে নেয়া সম্ভব হয় নি। তাই তখন তার নির্দেশ পালন করা হয় নি।

খবর শুনে হযরত উসমান(রা) বললেন, হয়ত আল্লাহর ইচ্ছা এই যে, কাফেলার সবগুলি উটই লোকটি পাবে। অতঃপর তিনি কাফেলার পরিচালককে নির্দেশ দিলেন যে সবগুলো উটই যেন লোকটিকে দেয়া হয়। লোকটিতো বিস্ময়ে অবাক ! অতো বড় কৃপণের কিভাবে এতো বড় দান করা সম্ভব হলো? হতবাক হয়ে সে তার পূর্ববর্তী তিন অভিজ্ঞতা জানাল এবং দু’প্রকার ব্যবহারের তাৎপর্য কি জানতে চাইল।

হযরত উসমান যে জবাব দিলেন তার সারমর্ম এই যে, আল্লাহ বিশ্বের সমস্ত সম্পদের মালিক, মানুষ হলো তত্ত্বাবধানকারী বা পাহারাদার। সে শুধু আল্লাহর ইচ্ছানুসারে সম্পদ নিজের জন্য এবং সমাজের অপরাপর ব্যক্তির কল্যাণের জন্য ব্যয় করতে পারবে।

মানুষের কাজ হলো আল্লাহর সম্পদ নিজের মর্জিমত রক্ষণাবেক্ষণ করা। যদি কোনো ব্যক্তির তত্ত্বাবধানকালে কোনো সম্পদের এক কণামাত্র বিনষ্ট হয় তবে তার জন্য আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। সম্পদের অধিকার শুধু বিশেষ সুবিধা নয়, বরং একটি বিরাট দায়িত্ব।”

শিক্ষাঃ

মুমিনকে অবশ্যই দানশীল হতে হবে, কিন্তু সে কখনো অপচয়কারী ও অপব্যয়কারী হতে পারবে না। কেনান “অপচয়কারী ও অপব্যয়কারী শয়তানের ভাই।”(আল কুরআন)।——-*****——–

১ম অংশ

নাম ’উসমান, কুনিয়াত আবু ’আমর, আবু আবদিল্লাহ, আবু লায়লা এবং লকব যুন-নূরাইন। (তাবাকাত ৩/৫৩, তাহজীবুত তাহজীব) পিতা ’আফ্‌ফান, মাতা আরওরা বিনতু কুরাইয। কুরাইশ বংশের উমাইয়্যা শাখার সন্তান। তাঁর উর্ধ পুরুষ ’আবদে মান্নাফে গিয়ে রাসূলুল্লাহর সা. নসবের সাথে তাঁর নসব মিলিত হয়েছে। খুলাফায়ে রাশেদার তৃতীয় খলীফা।

তাঁর নানী বায়দা বিনতু আবদিল মুত্তালিব রাসূলুল্লাহর সা. ফুফু। জন্ম হস্তীসনের ছ’বছর পরে ৫৭৬ খৃষ্টাব্দে। (আল–ইসতিয়াব) এ হিসাবে রাসূলে করীম সা. থেকে তিনি ছয় বছর ছোট।

তবে তাঁর জন্মসন সম্পর্কে বিস্তর মতভেদ রয়েছে। ফলে শাহাদাতের সময় তাঁর সঠিক বয়স কত ছিল সে সম্পর্কে অনুরূপ মতপার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। কোন কোন বর্ণনা মতে, তাঁর জন্ম হয় তায়েফে। (ফিত্‌নাতুল কুবরা, ডঃ তোহা হুসাইন)

হযরত ’উসমান রা. ছিলেন মধ্যমাকৃতির সুঠাম দেহের অধিকারী। মাংসহীন গণ্ডদেশ, ঘন দাড়ি, উজ্জ্বল ফর্সা, ঘন কেশ, বুক ও কোমর চওড়া, কান পর্যন্ত ঝোলানো যুলফী, পায়ের নলা মোটা, পশম ভরা লম্বা বাহু, মুখে বসন্তের দাগ, মেহেদী রঙের দাড়ি এবং স্বর্ণখচিত দাঁত।

হযরত ’উসমানের জীবনের প্রাথমিক অবস্থা অন্যান্য সাহাবীর মত জাহিলী যুগের অন্ধকারেই রয়ে গেছে। তাঁর ইসলামপূর্ব জীবন এমনভাবে বিলীন হয়েছে যেন ইসলামের সাথেই তাঁর জন্ম। ইসলামপূর্ব জীবনের বিশেষ কোন তথ্য ঐতিহাসিকরা আমাদের কাছে পৌঁছাতে পারেননি।

হযরত ’উসমান ছিলেন কুরাইশ বংশের অন্যতম কুষ্টিবিদ্যা বিশারদ। কুরাইশদের প্রাচীন ইতিহাসেও ছিল তাঁর গভীর জ্ঞান। তাঁর প্রজ্ঞা, অভিজ্ঞতা, সৌজন্য ও লৌকিকতাবোধ ইত্যাদি গুণাবলীর জন্য সব সময় তাঁর পাশে মানুষের ভীড় জমে থাকতো।

জাহিলী যুগের কোন অপকর্ম তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি। লজ্জা ও প্রখর আত্মমর্যাদাবোধ ছিল তাঁর মহান চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য। যৌবনে তিনি অন্যান্য অভিজাত কুরাইশদের মত ব্যবসা শুরু করেন। সীমাহীন সততা ও বিশ্বস্ততার গুণে ব্যবসায়ে অসাধারণ সাফল্য লাভ করেন। মক্কার সমাজে একজন বিশিষ্ট ধনী ব্যবসায়ী হিসাবে ‘গনী’ উপাধি লাভ করেন।

হযরত ’উসমানকে ‘আস-সাবেকুনাল আওয়ালুন’ (প্রথম পর্বে ইসলাম গ্রহণকারী), ‘আশারায়ে মুবাশ্‌শারা’ এবং সেই ছ’জন শ্রেষ্ঠ সাহাবীর মধ্যে গণ্য করা হয় যাঁদের প্রতি রাসূলে করীম সা. আমরণ খুশী ছিলেন। আবু বকর সিদ্দীকের সাথে তাঁর গভীর সম্পর্ক ছিল। তাঁরই তাবলীগ ও উৎসাহে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। (সীরাতে ইবন হিশাম) মক্কার আরো অনেক নেতৃবৃন্দের আচরণের বিপরীত হযরত ’উসমান রাসূলুল্লাহর সা. নবুওয়াতের সূচনা পর্বেই তাঁর দাওয়াতে সাড়া দেন এবং আজীবন জান-মাল ও সহায় সম্পত্তি দ্বারা মুসলমানদের কল্যাণব্রতী ছিলেন। হযরত ’উসমান বলেনঃ ‘আমি ইসলাম গ্রহণকারী চারজনের মধ্যে চতুর্থ।’ (উসুদুল গাবা) ইবন ইসহাকের মতে, আবু বকর, আলী এবং যায়িদ বিন হারিসের পরে ইসলাম গ্রহণকারী প্রথম ব্যক্তি হযরত উসমান।

হযরত ’উসমানের ইসলাম গ্রহণের প্রেক্ষাপট সম্পর্কে সীরাত লেখক ও মুহাদ্দীসগণ যেসব বর্ণনা দিয়েছেন তার সারকথা নিম্নরূপঃ

কেউ কেউ বলেন, তাঁর খালা সু’দা ছিলেন সে ‍যুগের একজন বিশিষ্ট ‘কাহিন’ বা ভবিষ্যদ্বক্তা।

তিনি নবী করীম সা. সম্পর্কে উসমানকে কিছু কথা বলেন এবং তাঁর প্রতি ঈমান আনার জন্য উৎসাহ দেন। তারই উৎসাহে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। (আল ফিত্‌নাতুল কুবরা) পক্ষান্তরে ইবন সা’দ সহ আরো অনেকে বর্ণনা করেনঃ হযরত উসমান সিরিয়া সফরে ছিলেন।

যখন তিনি ‘মুয়ান ও যারকার’ মধ্যবর্তী স্থানে বিশ্রাম করছিলেন তখন তন্দালু অবস্থায় এক আহবানকারীকে বলতে শুনলেনঃ ওহে ঘুমন্ত ব্যক্তিরা, তাড়াতাড়ি কর। আহমাদ নামের রাসূল মক্কায় আত্মপ্রকাশ করেছেন। মক্কায় ফিরে এসে শুনতে পেলেন ব্যাপারটি সত্য।

অতঃপর আবু বকরের আহ্‌বানে ইসলাম গ্রহণ করেন। (তাবাকাতঃ ৩/৫৫)

হযরত ’উসমান যখন ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন তখন তাঁর বয়স তিরিশের উপরে। ইসলামপূর্ব যুগেও আবু বকরের সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। প্রায় প্রতিদিনই তাঁর আবু বকরের বাড়ীতে যাতায়াত ছিল। একদিন হযরত আবু বকর রা. তাঁর সামনে ইসলাম পেশ করলেন। ঘটনাক্রমে রাসূল সা.ও তখন সে পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি বললেনঃ ’উসমান, জান্নাতের প্রবেশকে মেনে নাও।

আমি তোমাদের এবং আল্লাহর সকল মাখলুকের প্রতি তাঁর রাসূল হিসেবে এসেছি।

একথা ‍শুনার সাথে সাথে তিনি ইসলাম কবুল করেন। হযরত ’উসমানের ইসলাম গ্রহণের পর তাঁর খালা সু’দা তাঁকে অভিনন্দন জানিয়ে একটি কাসীদা রচনা করেছিলেন।

২য় অংশ

হযরত ’উসমানের সহোদরা আমীনা, বৈপিত্রীয় ভাই বোন ওয়ালীদ, খালীদ, আম্মারা, উম্মু কুলসুম সবাই মুসলমান হয়েছিলেন। তাঁদের পিতা উকবা ইবন আবী মুয়ীত। দারু কুত্‌নী বর্ণনা করেছেন, উম্মু কুলসুম প্রথম পর্বের একজন মুহাজির।

বলা হয়েছে তিনিই প্রথম কুরাইশ বধূ যিনি রাসূলুল্লাহর সা. হাতে বাইয়াত করেন। হযরত ’উসমানের অন্য ভাই-বোন মক্কা বিজয়ের সময় ইসলাম গ্রহণ করেন।

ইসলাম গ্রহণের পর কুরাইশদের একজন সম্মানিত ব্যক্তি হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে ইসলামের শত্রুদের লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়। তাঁর চাচা হাকাম ইবন আবিল ’আস তাঁকে রশি দিয়ে বেঁধে বেদম মার দিত।

সে বলতো, একটা নতুন ধর্ম গ্রহণ করে তুমি আমাদের বাপ-দাদার মুখে কালি দিয়েছ। এ ধর্ম ত্যাগ না করা পর্যন্ত তোমাকে ছাড়া হবে না। এতে হযরত ’উসমানের ঈমান একটু টলেনি। তিনি বলতেনঃ তোমাদের যা ইচ্ছে কর, এ দ্বীন আমি কক্ষণো ছাড়তে পারবো না। (তাবাকাতঃ ৩/৫৫)

হযরত উসমান ইসলাম গ্রহণের পর রাসূলুল্লাহ সা. নিজ কন্যা ‘রুকাইয়্যাকে’ তাঁর সাথে বিয়ে দেন। হিজরী দ্বিতীয় সনে মদীনায় রুকাইয়্যার ইনতিকাল হলে রাসূলুল্লাহ সা. তাঁর দ্বিতীয় কন্যা উম্মু কুলসুমকে তাঁর সাথে বিয়ে দেন।

এ কারণে তিনি ‘যুন-নূরাইন’- দুই জ্যোতির অধিকারী উপাধি লাভ করেন।

রুকাইয়্যা ছিলেন হযরত খাদীজার রা. গর্ভজাত সন্তান।

তাঁর প্রথম শাদী হয় উতবা ইবন আবী লাহাবের সাথে এবং উম্মু কুলসুমের শাদী হয় আবু লাহাবের দ্বিতীয় পুতু ’উতাইবার সাথে। আবু লাহাব ছিল আল্লাহর নবীর কট্টর দুশমন। পবিত্র কুরআনের সূরা লাহাব নাযিলের পর আবু লাহাব ও তার স্ত্রী উম্মু জামীল (হাম্মা লাতাল হাতাব) তাদের পুত্রদ্বয়কে নির্দেশ দিল ‍মুহাম্মাদের কন্যাদ্বয়কে তালাক দেওয়ার জন্য। তারা তালাক দিল।

অবশ্য ইমাম সুয়ূতী মনে করেন, ইসলাম গ্রহণের পূর্বেই রুকাইয়্যার সাথে উসমানের শাদী হয়।

উপরোক্ত ঘটনার আলোকে সুয়ূতির মতটি গ্রহণযোগ্য মনে হয় না।

নবুওয়াতের পঞ্চম বছরে মক্কার মুশরিকদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে প্রথম যে দলটি হাবশায়

হিজরাত করেছিলেন তাঁদের মধ্যে ’উসমান ও তাঁর স্ত্রী রুকাইয়্যাও ছিলেন। হযরত আনাস রা. বলেনঃ ‘হাবশার মাটিতে প্রথম হিজরাতকারী উসমান ও তাঁর স্ত্রী নবী দুহিতা রুকাইয়্যা।’ রাসূল সা. দীর্ঘদিন তাঁদের কোন খোঁজ-খবর না

পেয়ে ভীষণ উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়েন। সেই সময় এক কুরাইশ মহিলা হাবশা থেকে মক্কায় এলো।

তার কাছে রাসূল সা. তাঁদের দু’জনের কুশল জিজ্ঞেস করেন। সে সংবাদ দেয়, ‘আমি দেখেছি, রুকাইয়্যা গাধার ওপর সওয়ার হয়ে আছে এবং ’উসমান গাধাটি তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। রাসূল সা. তাঁর জন্য দু’আ করেনঃ আল্লাহ তার সহায় হোন।

লূতের আ. পর ’উসমান আল্লাহর রাস্তায় পরিবার পরিজনসহ প্রথম হিজরাতকারী। (আল–ইসাবা) হাবশা অবস্থানকালে তাঁদের সন্তান আবদুল্লাহ জন্মগ্রহণ করে এবং এ ছেলের নাম অনুসারে তাঁর কুনিয়াত হয় আবু আবদিল্লাহ।

হিজরী ৪র্থ সনে আবদুল্লাহ মারা যান। রুকাইয়্যার সাথে তাঁর দাম্পত্য জীবন খুব সুখের হয়েছিল।

লোকেরা বলাবলি করতো কেউ যদি সর্বোত্তম জুটি দেখতে চায়, সে যেন উসমান ও রুকাইয়্যাকে দেখে।

হযরত উসমান বেশ কিছু দিন হাবশায় অবস্থান করেন।

অতঃপর মক্কায় ফিরে আসেন এই গুজব শুনে যে, মক্কার নেতৃবৃন্দ ইসলাম গ্রহণ করেছে।

রাসূলুল্লাহর সা. মদীনায় হিজরাতের পর আবার তিনি মদীনায় হিজরত করেন। এভাবে তিনি ‘যুল হিজরাতাইন’- দুই হিজরাতের অধিকারী হন।

একমাত্র বদর ছাড়া সকল যুদ্ধে তিনি রাসূলুল্লাহর সা. সাথে অংশগ্রহণ করেছেন।

রাসূল সা. যখন বদর যুদ্ধে রওয়ানা হন, হযরত রুকাইয়্যা তখন রোগ শয্যায়।

রাসূলের সা. নির্দেশে হযরত ’উসমান পীড়িত স্ত্রীর সেবার জন্য মদীনায় থেকে যান। বদরের বিজয়ের খবর যেদিন মদীনায় এসে পৌঁছুলো সেদিনই হযরত রুকাইয়্যা ইনতিকাল করেন।

রাসূল সা. উসমানের জন্য বদরের যোদ্ধাদের মত সওয়াব ও গনীমতের অংশ ঘোষণা করেন। (তাবাকাতঃ ৩/৫৬) এ হিসেবে পরোক্ষভাবে তিনিও বদরী সাহাবী।

রুকাইয়্যার ইনতিকালের পর রাসূল সা. রুকাইয়্যার ছোট বোন উম্মু কুলসুমকে উসমানের সাথে বিয়ে দেন হিজরী তৃতীয় সনে।

একটি বর্ণনায় জানা যায়, আল্লাহর নির্দেশেই রাসূল সা. উম্মু কুলসুমকে ’উসমানের সাথে বিয়ে দেন।

হিজরী নবম সনে উম্মু কুলসুমও নিঃসন্তান অবস্থায় মারা যান। উম্মু কুলসুমের মৃত্যুর পর রাসূল সা. বলেনঃ ‘আমার যদি তৃতীয় কোন মেয়ে থাকতো তাকেও আমি ’উসমানের সাথে বিয়ে দিতাম।’ (হায়াতু ’উসমানঃ রিজা মিসরী)

হযরত ’উসমান উহুদের যুদ্ধেও অংশগ্রহণ করেন। কিন্তু সেই মুষ্টিমেয় কিছু যোদ্ধাদের মত রাসূলুল্লাহর সাথে অটল থাকতে পারেননি। অধিকাংশ মুজাহিদদের সাথে তিনিও ময়দান ছেড়ে চলে যান। অবশ্য আল্লাহ তায়ালা তাদের জন্য ক্ষমা ঘোষাণো করেছেন। পরবর্তী সকল যুদ্ধেই অন্যসব বিশিষ্ট সাহাবীদের মত অংশগ্রহণ করেছেন।

রাসূল সা. তাবুক অভিযানের প্রস্তুতির ঘোষণা দিলেন। মক্কা ও অন্যান্য আরব গোত্রসমূহেও ঘোষণা দিলেন এ অভিযানে অংশগ্রহণের জন্য। ইসলামী ফৌজের সংগঠন ও ব্যায় নির্বাহের সাহায্যের আবেদন জানালেন। সাহাবীরা ব্যাপকভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন। আবু বকর তাঁর সকল অর্থ রাসূলের হাতে তুলে দিলেন। ’উমার তাঁর মোট অর্থের অর্ধেক নিয়ে হাজির হলেন।

আর এ যুদ্ধের এক তৃতীয়াংশ সৈন্যের যাবতীয় ব্যয়ভার উসমান নিজ কাঁধে তুলে নিলেন। তিনি সাড়ে নয় শ’ উট ও পঞ্চাশটি ঘোড়া সরবরাহ করেন। ইবন ইসহাক বলেন, তাবুকের বাহিনীর পেছনে হযরত উসমান এত বিপুল অর্থ ব্যয় করেন যে, তাঁর সমপরিমাণ আর কেউ ব্যয় করতে পারেনি। কোন কোন বর্ণনায় এসেছে, তাবুকে রণপ্রস্তুতির জন্য উসমান কোরচে করে এক হাজার দীনার নিয়ে এসে রাসূলুল্লাহর কোলে ঢেলে দেন।

রাসূল সা. খুশীতে দীনারগুলি উল্টে পাল্টে দেখেন এবং বলেনঃ ‘আজ থেকে ’উসমান যা কিছুই করবে, কোন কিছুই তার জন্য ক্ষতিকর হবেনা।’ এভাবে অধিকাংশ যুদ্ধের প্রস্তুতির সময় তিনি প্রাণ খুলে চাঁদা দিতেন।

একটি বর্ণনায় এসেছে, তাবুকের যুদ্ধে তাঁর দানে সন্তুষ্ট হয়ে রাসূল সা. তাঁর আগে-পিছের সকল গুনাহ মাফের জন্য দু’আ করেন এবং তাঁকে জান্নাতের ওয়াদা করেন। (আল–ফিতনাতুল কুবরা)

৩য় অংশ

হুদাইবিয়ার ঘটনা। রাসূল সা. ’উমারকে ডেকে বললেনঃ তুমি মক্কায় যাও। মক্কার নেতৃবৃন্দকে আমাদের আগমণের উদ্দেশ্য অবহিত কর। ’উমার বিনীতভাবে বললেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! কুরাইশদের কাছ থেকে আমার জীবনের আশঙ্কা করছি।

আপনি জানেন তাদের সাথে আমার দুশমনি কতখানি। আমি মনে করি উসমানই এ কাজের উপযুক্ত। রাসূল সা. ’উসমানকে ডাকলেন। আবু সুফিয়ান ও অন্যান্য কুরাইশ নেতৃবৃন্দের নিকট এ পয়গামসহ উসমানকে পাঠালেন যে, আমরা যুদ্ধ নয়, বরং ‘বাইতুল্লাহর’ যিয়ারতের উদ্দেশ্যে এসেছি।

রাসূলুল্লাহর সা. পয়গাম নিয়ে উসমান মক্কায় পৌঁছলেন। সর্ব প্রথম আবান ইবন সাঈদ ইবন আস- এর সাথে তাঁর দেখা হয়। আবান তাঁকে নিরাপত্তা দেন। আবানকে সঙ্গে করে তিনি কুরাইশ নেতৃবৃন্দের সাথে দেখা করে রাসূলুল্লাহর সা. পয়গাম পৌঁছে দেন।

তারা ’উসমানকে বলেন, তুমি ইচ্ছে করলে ‘তাওয়াফ’ কতে পার। কিন্তু ’উসমান তাদের এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেন, আল্লাহর রাসূল সা. যতক্ষণ ‘তাওয়াফ’ না করেন, আমি ‘তাওয়াফ’ করতে পারিনে। কুরাইশরা তাঁর এ কথায় ক্ষুব্ধ হয়ে তাঁকে আটক করে।

কোন কোন বর্ণনায় এসেছে, ’উসমানকে তারা তিনদিন আটক করে রাখে।

এ দিকে হুদাইবিয়ায় মুসলিম শিবিরে গুজব ছড়িয়ে পড়ে উসমানকে শহীদ করা হয়েছে।

রাসূল সা. ঘোষণা করলেন ’উসমানের রক্তের বদলা না নিয়ে আমরা প্রত্যাবর্তন করবো না।

রাসূল সা. নিজের ডান হাতটি বাম হাতের ওপরে রেখে বলেনঃ হে আল্লাহ, এ বাইয়াত ’উসমানের পক্ষ থেকে। সে তোমার ও তোমার রাসূলের কাজে মক্কায় গেছে। হযরত ’উসমান মক্কা থেকে ফিরে এসে বাইয়াতের কথা জানতে পারেন।

তিনি নিজেও রাসূলুল্লাহর হাতে বাইয়াত করেন। ইতিহাসে এ ঘটনা বাইয়াতু রিদওয়ান, বাইয়াতুশ শাজারা ইত্যাদি নামে খ্যাত হয়েছে।

পবিত্র কুরআনে এ বাইয়াতের প্রশংসা করা হয়েছে।

রাসূলুল্লাহর ওফাতের পর যখন আবু বকরের হাতে বাইয়াত নেওয়া হচ্ছিল উসমান সংবাদ পেয়ে খুব দ্রুত সেখানে যান এবং আবু বকরের হাতে বাইয়াত করেন। মৃত্যুকালে আবু বকর ’উমারকে রা. খলীফা মনোনীত করে যে অঙ্গীকার পত্রটি লিখে যান, তার লিখক ছিলেন ’উসমান। খলীফা ’উমারের রা. হাতে তিনিই সর্বপ্রথম বাইয়াত করেন।

হযরত ’উমার রা. ছুরিকাহত হয়ে যখন মৃত্যু শয্যায়, তাঁর কাছে দাবী করা হলো পরবর্তী খলীফা নির্বাচনের জন্য।

কিন্তু তিনি ইতস্ততঃ করে বললেনঃ আমি যদি খলিফা বানিয়ে যাই, তবে তার দৃষ্টান্ত অবশ্য আছে, যেমনটি করেছেন আমার থেকেও এক উত্তম ব্যক্তি, অর্থাৎ আবু বকর রা. আর যদি না-ও বানিয়ে যাই তারও দৃষ্টান্ত আছে। যেমনটি করেছিলেন আমার থেকেও এক উত্তম ব্যক্তি, অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ সা.। তিনি আরো বললেনঃ আবু ’উবাইদা জীবিত থাকলে তাকেই খলীফা বানিয়ে যেতাম।

আমার রব আমাকে জিজ্ঞেস করলে বলতাম, আপনার নবীকে আমি বলতে শুনেছি, তিনি এই উম্মাতের আমীন বা পরম বিশ্বাসী ব্যক্তি। যদি আবু হুজাইফার আযাদকৃত দাস সালেমও আজ জীবিত থাকতো, তাকেও খলীফা বানিয়ে যেতে পারতাম, আমার রব জিজ্ঞেস করলে বলতাম,, আপনার নবীকে আমি বলতে শুনেছি, সালেম বড় আল্লাহ-প্রেমিক। এক ব্যক্তি তখন বললো, আবদুল্লাহ ইবন উমার তো আছে। তিনি বলে উঠলেন, আল্লাহ তোমার অমঙ্গল করুন। কসম আল্লাহর, আমি আল্লাহর কাছে এমনটি চাই না।

খিলাফতের এ দায়িত্বের মধ্যে যদি ভালো কিছু থাকে, আমার বংশের থেকে আমি তা লাভ করেছি। আর যদি তা মন্দ হয় তাও আমরা পেয়েছি। উমারের বংশের এক ব্যক্তির হিসাব নিকাশই এজন্য যথেষ্ট।

আমি আমার নিজের নফসের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছি, আমার পরিবারবর্গকে মাহরূম করেছি। কোন পুরস্কারও নয় এবং কোন তিরস্কারও নয় এমনভাবে যদি আমি কোন মতে রেহাই পাই, নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করবো।

যখন একই কথা তাঁর কাছে আবার বলা হলো, তিনি আলীর রা. দিকে ইঙ্গিত বললেন, তোমাদেরকে হকের ওপর পরিচালনার তিনিই যোগ্য। তবে আমি জীবিত ও মৃত উভয় অবস্থায় এ দায়িত্ব বহন করতে রাজী নই।

তোমাদের সামনে এই একটি দল আছেন, যঁদের সম্পর্কে রাসূল সা. বলেছেন, তাঁরা জান্নাতের অধিবাসী। তাঁরা হলেন- আবদে মান্নাফের দুই পুত্র আলী ও উসমান, রাসূলের সা. দুই মাতুল আবদুর রাহমান ও সা’দ, রাসূলের সা. হাওয়ারী ও ফুফাতো ভাই যুবাইর ইবনুল আওয়াম এবং তালহা তাঁদের যে কোন একজনকে খলীফা নির্বাচিত করবে।

তাঁদের যে কেউ খলীফা নির্বাচিত হলে তোমরা তাঁকে সাহায্য করবে, তাঁর সাথে সুন্দর আচরণ করবে। তিনি যদি তোমাদের কারো ওপর কোন দায়িত্ব অর্পণ করেন, যথাযথভাবে তোমরা তা পালন করবে।

হযরত ’উমার উল্লেখিত দলটির সদস্যদের ডেকে বললেন, আপনাদের ব্যাপারে আমি ভেবে দেখিছি। আপনারা জনগণের নেতা ও পরিচালক। খিলাফতের দায়িত্বটি আপনাদের মধ্যেই থাকা উচিত।

আপনাদের প্রতি সন্তুষ্ট অবস্থায় রাসূল সা. ইনতিকাল করেছেন। আপনারা ঠিক থাকলে জনগণের ব্যাপারে আমার কোন ভয় নেই। তবে আপনাদের পারস্পরিক বিবাদকে আমি ভয় করি। জনগণ তাতে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়বে।

তারপর তিনি নির্বাচনের সময় নির্ধারণ করেছিলেন তাঁর মৃত্যুর পর তিন দিন তিন রাত্রি।

মিকদাদ ইবনুল আসওয়াদকে বলরেন, আমাকে কবরে শায়িত করার পর এই দলটিকে একত্র করবে এবং তাঁরা তাদের মধ্য থেকে একজনকে নির্বাচন করবে। সুহায়িবকে বললেনঃ তিন দিন তুমি নামাযের জামায়াতের ইমামতি করবে।

আলী, উসমান, সা’দ, ’আবদুর রাহমান, যুবাইর ও তালহার কাছে যাবে, যদি তালহা মদীনায় থাকে (তালহা তখন মদীনার বাইরে ছিলেন)। তাদেরকে এক স্থানে সমবেত করবে। আবদুল্লাহ ইবন উমারকেও হাজির করবে।

তবে খিলাফতের কোন হক তার নেই। তাঁদের প্রতি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখবে। তাঁদের পাঁচজন যদি কোন একজনের ব্যাপারে একমত হয় এবং একজন দ্বিমত পোষণ করে, তরবারি দিয়ে তার কল্লা কেটে ফেলবে।

আর যদি চারজন একমত হয় এবং দু’জন অস্বীকার করে, তবে সে দু’জনের কল্লা উড়িয়ে দেবে। আর যদি তিনজন করে দু’ভাগে ভাগ হয়ে যায়, আবদুল্লাহন বিন ’উমার যে পক্ষ সমর্থন করবে তারা তাদের মধ্য থেকে একজনকে নির্বাচন করবে। অন্য পক্ষ যদি আবদুল্লাহ বিন ’উমারের সিদ্ধান্ত না মানে, তাহলে আবদুর রাহমান বিন ’আউফ যে দিকে থাকবে তোমরা সে দিকে যাবে।

বিরোধীরা যদি জনগণের সিদ্ধান্ত না মানে তাহলে তাদেরকে মানাতে বাধ্য করবে।

হযরত ’উমারকে দাফন করার পর মিকদাদ বিন আসওয়াদ শূরার সদস্যদের মিসওয়ার ইবনুল মাখরামা মতান্তরে হযরত আয়িশার হুজরায় একত্র করলেন। তাঁরা পাঁচজন। তালহা তখনো মদীনার বাইরে। তাঁদের সাথে যুক্ত হলেন আবদুল্লাহ বিন ’উমার। বাড়ীর দরজায় প্রহরী নিয়োগ করা হলো আবু তালহাকে। বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা ও তুমুল বাক-বিতণ্ডা হলো। এক পর্যায়ে আবদুর রাহমান বললেনঃ তোমাদের মধ্যে এমন কে আছ, যে তার দাবী ত্যাগ করতে পার এবং তোমাদের উত্তম ব্যক্তিকে নির্বাচনের দায়িত্ব আমার ওপর অর্পণ করতে পার? আমি আমার খিলাফতের দাবী ত্যাগ করছি। হযরত ’উসমান সর্বপ্রথম এ প্রস্তাবে রাজী হয়ে আবদুর রাহমানের হাতে তাঁর ক্ষমতা ন্যস্ত করলেন। তারপর অন্য সকলে তাঁর অনুসরণ করলেন। এভাবে খলীফা নির্বাচনের গোটা দায়িত্বটি আবদুর রাহমানের ওপর এসে বর্তায়।

হযরত আবদুর রাহমান দিনরাত রাসূলুল্লাহর সা. অন্যসব সাহাবী, মদীনায় অবস্থানরত সকল সেনা-অফিসার, সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিবর্গসহ সকল স্তরের জনপ্রতিনিধিদের সাথে আলোচনা করলেন। কখনো ব্যক্তিগতভাবে, কখনো সম্মিলিতভাবে। প্রায় সকলেই হযরত উসমানের পক্ষে তাদের মতামত ব্যক্ত করলেন।

যেদিন সকালে ’উমার-নির্ধারিত সময় সীমা শেষ হবে, সে রাতে আবদুর রাহমান এলেন মাখরামার বাড়ীতে। তিনি প্রথমে যুবাইর ও সা’দকে ডেকে মসজিদে নববীর সুফ্‌ফায় বসে এক এক করে তাঁদের সাথে কথা বললেন, এভাবে ’উসমান ও আলীর সাথেও সুবহে সাদিক পর্যন্ত একান্তে আলাপ করেন।

এদিকে মসজিদে নববী লোকে পরিপূর্ণ। শেষ সিদ্ধান্তটি শোনার জন্য সবাই ব্যাকুল। ফজরের নামাযের পর সমবেত মদীনাবাসীদের উদ্দেশ্যে সংক্ষিপ্ত এক ভাষণের পর আবদুর রাহমান খলীফা হিসেবে হযরত ’উসমানের নামটি ঘোষণা করেন এবং তাঁর হাতে বাইয়াত করেন। তারপরই হযরত আলীও বাইয়াত করেন। অতঃপর সমবেত জনমণ্ডলী হযরত ’উসমানের হাতে বাইয়াত করেন। হিজরী ২৪ সনের ১লা মুহাররম সোমবার সকালে তিনি খিলাফতের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। (তারীখুল উম্মাহ আল–ইসলামিয়্যাহ, খিদরী বেক)

হযরত ’উসমান অত্যন্ত দক্ষতার সাথে খিলাফতের দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। খিলাফতের প্রথম পর্যায়ে তাঁর বিরুদ্ধে তেমন অভিযোগ শোনা যায়না। তবে শেষের দিকে বসরা, কুফা, মিসর প্রভৃতি অঞ্চল থেকে তাঁর বিরুদ্ধে অসন্তোষ দানা বেঁধে উঠতে থাকে। মূলতঃ এ অসন্তোষ সৃষ্টির পশ্চাতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে পরাজিত ইয়াহুদী শক্তি। ধীরে ধীরে তারা সংঘবদ্ধভাবে বিদ্রোহী হয়ে উঠে এবং মদীনার খলীফার বাসভবন ঘেরাও করে। এই বিদ্রোহীদের মধ্যে কোন উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি ছিল না।

তারা খলীফাকে হত্যার হুমকি দিয়ে পদত্যাদ দাবী করে।

খলীফার বাসগৃহের খাদ্য ও পানি সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। মসজিদে নামায আদায়ে বাধা সৃষ্টি করে। এক পর্যায়ে তারা খলীফার বাড়ীতে ঢুকে পড়ে এবং রোযা অবস্থায় কুরআন তিলাওয়াতরত বয়োবৃদ্ধ খলীফাকে হত্যা করে।

(ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন) এ ঘটনা সংঘটিত হয় হিজরী ৩৫ সনের ১৮ জিলহজ্জ, শুক্রবার আসর নামাযের পর। রাসূলের সা. ওফাত ও হযরত উসমানের শাহাদাতের মধ্যে ২৫ বছরের ব্যবধান।

বারো দিন কম বারো বছর তিনি খিলাফতের দায়িত্ব পালন করেন।

জান্নাতুল বাকীর ‘হাশশে কাওকাব’ নামক অংশে তাঁকে দাফন করা হয়।

মাগরিব ও ঈশার মাঝামাঝি সময়ে তাঁর দাফন কার্য সমাধা হয়। যুবাইর ইবন মুতঈম রা. তাঁর জানাযার ইমামতি করেন। কাবুল থেকে মরক্কো পর্যন্ত বিশাল খিলাফতের কর্ণধারের জানাযায় মাত্র সত্তরজন লোক অংশগ্রহণ করেছিলেন।

মৃত্যুকালে তাঁর বয়স কত হয়েছিল সে সম্পর্কে মতপার্থক্য রয়েছে। তবে ৮২ থেকে ৯০ বছরের মধ্যে ছিল। (আল–ফিত্‌নাতুল কুবরা)

খলীফা উসমান বিদ্রোহীদের দ্বারা ঘেরাও হওয়ার পর ইচ্ছা করলে তাদের নির্মূল করতে পারতেন।

অন্য সাহাবীরা সেজন্য প্রস্তুতও ছিলেন। কিন্তু হযরত উসমান নিজের জন্য কোন মুসলমানের রক্ত ঝরাতে চাননি।

তিনি চাননি মুসলমানদের মধ্যে রক্তপাতের সূচনাকারী হতে। প্রকৃতপক্ষে এমন এক নাজুক মুহূর্তে হযরত উসমান রা. যে কর্ম-পদ্ধতি অবলম্বন করেন তা একজন খলীফা ও একজন বাদশার মধ্যে যে পার্থক্য তা স্পষ্ট করে তোলে।

তাঁর স্থলে যদি কোন বাদশাহ হতো, নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে যেকোন কৌশল প্রয়োগ করতে দ্বিধাবোধ করতো না। তাতে যত ক্ষতি বা ধ্বংসই হোক না কেন। কিন্তু তিনি ছিলেন খলীফা রাশেদ। নিজের জীবন দেওয়াকে তুচ্ছ মনে করেছেন।

তবুও যেন এমন সম্মান বিনষ্ট না হতে পারে যা একজন মুসলমানের সবকিছু থেকে প্রিয় হওয়া উচিত।’ (খিলাফত ও মুলুকিয়্যাতঃ আবুল আ’লা মওদূদী)

ইসলামের জন্য হযরত ’উসমানের অবদান মুসলিম জাতি কোন দিন ভুলতে পারবে না। ইসলামের সেই সংকটকালে আল্লাহর রাস্তায় তিনি যেভাবে খরচ করেছেন, অন্য কোন ধনাঢ্য মুসলমানের মধ্যে তার কোন নজীর নেই। তিনি বিস্তর অর্থের বিনিময়ে ইয়াহুদী মালিকানাধীন ‘বীরে রুমা’- কূপটি খরীদ করে মদীনার মুসলমানদের জন্য ওয়াক্‌ফ করেন। বিনিময়ে রাসূল সা. তাঁকে জান্নাতের অঙ্গীকার করেন। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস যিনি একদিন ‘বীরে রুমা’ ওয়াক্‌ফ করে মদীনাবাসীদের পানি-কষ্ট দূর করেছিলেন, তাঁর বাড়ীতেই সেই কূপের পানি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। সেই ঘেরাও অবস্থায় একদিন তিনি জানালা দিয়ে মাথা বের করে মদীনাবাসীদের স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, রাসূলুল্লাহর সা. নির্দেশে আমিই বীরে রুমা খরীদ করে সর্বসাধারণের জন্য ওয়াক্‌ফ করেছি। আজ সেই কূপের পানি থেকেই তোমরা আমাকে বঞ্চিত করছো। আমি আজ পানির অভাবে ময়লা পানি দিয়ে ইফতার করছি।

হযরত উসমানের ফজীলাত ও মর্যাদা সম্পর্কে রাসূল সা. হতে যত হাদীস বর্ণিত হয়েছে তার সারকথাঃ তিনি রাসূলুল্লাহর সা. অত্যন্ত প্রিয় ছিলেন। রাসূলুল্লাহর নিকটতম ব্যক্তিদের মধ্যে তাঁর বিশেষ স্থান ছিল। রাসূল সা. বার বার তাঁকে জান্নাতের খোশখবর দিয়েছেন।

নবী সা. বলেছেনঃ ‘প্রত্যেক নবীরই বন্ধু থাকে, জান্নাতে আমার বন্ধু হবে উসমান।’ (তিরমিযী) হযরত আবদুল্লাহ ইবন উমার বলেনঃ নবীর সা. সময়ে মুসলমানরা আবু বকর, ’উমার ও উসমানকে সকলের থেকে অধিক মর্যাদাবান মনে করতেন। তা ছাড়া অন্য কোন সাহাবীকে বিশেষ কোন মর্যাদা দেওয়া হতো না।

হযরত উসমান রা. রাসূলুল্লাহর সা. সময়ে ‘কাতিবে অহী’- অহী লিখক ছিলেন। সিদ্দীকী ও ফারুকী যুগে ছিলেন পরামর্শদাতা। প্রতিবছরই তিনি হজ্জ আদায় করতেন। তবে যে বছর শহীদ হন, ঘেরাও থাকার কারণে হজ্জ আদায় করতে পারেননি।

সারা বছরই রোযা রাখতেন। সারা রাত ইবাদতে কাটতো। এক রাকআতে একবার কুরআন শরীফ খতম করতেন। রাতে কারও ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতেন না। রাতে চাকরদের খিদমাত গ্রহণ করতেন না। তিনি ছিলেন অত্যন্ত লাজুক।

রাসূল সা. বলেছেনঃ আমার উম্মাতের মধ্যে উসমান সর্বাধিক লজ্জাশীল। তিনি আরো বলেছেনঃ উসমানকে দেখে ফিরিশতারাও লজ্জা পায়। আত্মীয়-বন্ধুদের প্রতি ছিলেন অত্যন্ত সদয়।

তাঁর গুণাবলী ও মর্যাদা সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধে প্রকাশ করা যাবে না।——-*****——–

উসমান (রা) কিভাবে খলীফা হলেন

দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমার ফারূকের শাহাদাত প্রাপ্তির পর খলীফা নির্বাচন নিয়ে মতানৈক্যের সৃষ্টি হলো।

শাহাদাতের পূর্বে হযরত উমারকে (রা) ভাবি খলীফা নির্বাচন সম্পর্কে তাঁর মতামত জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল।

হযরত উমার (রা) কোন বিশেষ একজনের নাম না করে হযরত আলী (রা), হযরত উসমান (রা), হযরত আবদুর রহমান (রা), হযরত সা‘দ (রা), হযরত তালহা (রা) ও হযরত যুবাইর (রা) এ ছয় জনের নাম প্রস্তাব করেছিলেন।

কিন্ত ‍নির্বাচন সভায় তাদের মধ্য থেকে একজনকে নির্বাচন করতে গিয়ে বিভিন্ন মত এমনকি ছয় জনকে নিয়ে ছয়টি ভিন্ন ভিন্ন ভাগেরই সৃষ্টি হয়ে গেল। আলোচনায় অচলাবস্থার সৃষ্টি হলো।

অবশেষে যুবাইর বললেন, ‘আমি হযরত আলীর স্বপক্ষে আমার দবী পরিত্যাগ করলাম’। হযরত তালহা দাঁড়িয়ে বললেন, ‘খিলাফাতের দায়িত্ব মাথায় নিতে আমি একেবারে অক্ষম।

সুতরাং আমার দাবী আমি হযরত উসমান গনির (রা) উপর অর্পন করলাম।’ হযরত সা‘দ (রা) দন্ডায়মান হয়ে বললেন, ‘আমার মতে খিলাফতের যোগ্য ব্যক্তি হযরত আবদুর রহমান ইকন আউফকে সমর্থন করছি।”

অতপর সমস্যা ছয় থেকে তিনে এসে দাঁড়াল।

সেদিনকার মত সভা ভেঙ্গে গেল। মীমাংসা হলোনা। বাড়ী গিয়ে হযরত আব্দুল রহামান ইবন আউফ চিন্তা করলেন, হযরত আলী ও হযরত উসমানের মতো যোগ্য ব্যক্তি উপস্থিত থাকতে খিলাফত পদ আমার জন্য সাজে না।

বিষয়ট চিন্তা করেই হযরত আবদুর রহামান ইবন আউফ হযরত আলীর কাছে উপস্থি হয়ে বললেন, “আমি আদৌ খলীফা হতে চাইনে, আর এইভাবে খলীফাহীন অবস্থায় মুসলিম জাহান একদিনও থাকা উচিত নয়।

এজন্য আমি চাই, সত্বরই একটি সভা আহবান করে আপনাকে খলীফা হিসেবে ঘোষণা করি। সম্মান ও সম্পদের প্রতি চির বীতশ্রদ্ধ হযরত আলী বললেন, “উত্তম, আমিও খলীফা নির্বাচন ব্যাপারে বিলম্ব পছন্দ করিনা।

আর খিলাফতের দায়িত্বকে গুরুতর বোঝা মনে করি।

অতপর আসুন কালই আমরা হযরত উসমানকে (রা) খলীফা পতে বরণ করি।’

হযরত আলীর প্রস্তাব অনুসারেই কাজ হলো। পরবর্তী দিনের সভায় হযরত উসমান (রা) খলীফা নির্বাচিত হলেন।——-*****——–

হযরত উসমানের (রা) শাসন কাল। নীল ভূমধ্যসাগর তীরের তারাবেলাস নগরী।

পরাক্রমশালী রাজা জার্জিসের প্রধান নগরী এটা। এই পরাক্রমশালী রাজা ১লক্ষ ২৯ হাজার সৈন্য নিয়ে ‘আবদুল্লাহ ইবন সাদের নেতৃত্বাধীন মুসলিম বাহিনীর অগ্রাভিযানের পথ রোধ করে দাঁড়ালেন।

স্বয়ং রাজা জার্জিস তাঁর বাহিনীর পরিচালনা করছেন। পাশে রয়েছে তাঁর মেয়ে। অপরূপ সুন্দরী তাঁর সে মেয়ে।

যুদ্ধ শুরু হল। জার্জিস মনে করেছিলেন তাঁর দুর্ধষ্য বাহিনী এবার মুসলিম বাহিনীকে উচিত শিক্ষা দেবে। কিন্তু তা হল না। মুসলিম বাহিনীর পাল্টা আঘাতে জার্জিস বাহিনীর ব্যুহ ভেংগে পড়ল।

উপায়ান্তর না দেখে তিনি সেনা ও সেনানীদের উৎসাহিত করার জন্য ঘোষণা করলেন, “যে বীর পুরুষ মুসলিম সেনাপতি আবদুল্লাহর ছিন্ন শির এনে দিতে পারবে, আমার কুমারী কন্যাকে তার হাতে সমর্পন করবো।”

জার্জিসের এই ঘোষণা তাঁর সেনাবাহিনীর মধ্যে উৎসাহের এক তড়িৎ প্রবাহ সৃষ্টি করল। তাদের আক্রমণ ও সমাবেশে নতুন উদ্যোগ ও নতুন প্রাণাবেগ পরিলক্ষিত হলো। জার্জিসের সুন্দরী কন্যা লাভের উদগ্র কামনায় তারা যেন মরিয়া হয়ে উঠল।

তাদের উন্মাদ আক্রমণে মুসলিম রক্ষা ব্যুহে ফাটল দিল। মহানবীর শ্রেষ্ঠ সাহাবা হযরত যুবাইরও সে যুদ্ধে শরীক ছিলেন। তিনি সেনাপতি সাদকে পরামর্শ দিলেন, “আপনিও ঘোষণা করুন, যে তারা বেলাসের শাসনকর্তা জার্জিসের ছিন্নমুন্ড এনে দিতে পারবে, তাকে সুন্দরী জার্জিস দুহিতাসহ এক হাজার দিনার বখশিশ দেব।” যুবাইরের পরামর্শ অনুসারে সেনাপতি সা‘দ এই কথাই ঘোষণা করে দিলেন।

তারাবেলাসের প্রান্তরে ঘোরতর যুদ্ধ সংঘটিত হলো। যুদ্ধে জার্জিস পরাজিত হলেন। তাঁর কর্তিত শিরহস জার্জিস কন্যাকে বন্দী করে মুসলিম শিবিরে নিয়ে আসা হলো। কিন্তু এই অসীম সাহসিকতার কাজ কে করল? এই বীরত্বের কাজ কার দ্বারা সাধিত হলো?

যুদ্ধের পর মুসলিম শিবিরে সভা আহূত হলো। হাজির করা হলো জার্জিস-দুহিতাকে। সেনাপতি সা‘দ জিজ্ঞেস করলেন, “আপনাদের মধ্যে যিনি জার্জিসকে নিহত করেছেন, তিনি আসুন। আমার প্রতিশ্রুত উপহার তাঁর হাতে ‍তুলে দিচ্ছি।”

কিন্তু গোটা মুসলিম বাহিনী নীরব নিস্তব্ধ।

কেউ কথা বলল না, কেউ দাবী নিয়ে এগুলোনা। সেনাপতি সা‘দ বার বার আহবান জানিয়েও ব্যর্থ হলেন। এই অভূতপূর্ব ব্যাপার দেখে বিস্ময়ে হতবাক হলেন জার্জিস দুহিতা। তিন দেখতে পাচ্ছেন তাঁর পিতৃহন্তাকে।

কিন্তু তিনি দাবী নিয়ে আসছেন না কেন? টাকার লোভ, সুন্দরী কুমারীর মোহা তিনি উপেক্ষা করছেন? এতি বড় স্বার্থকে উপেক্ষা করতে পারে জগতের ইতিহাসে এমন জিতেন্দ্রীয় যোদ্ধা-জাতির নাম তো কখনও শুনেননি তিনি।

পিতৃহত্যার প্রতি তাঁর যে ক্রোধ ও ঘৃণা ছিল, তা যেন মুহূর্তে কোথায় অন্তর্হিত হয়ে গেল। অপরিচিত এক অনুরাগ এসে সেখানে স্থান করে নিল।

অবশেষে সেনাপতির আদেশে জার্জিস দুহিতাই যুবাইরকে দেখিয়ে দিলেন।

বললেন, “ইনিই আমার পিতৃহন্ত, ইনিই আপনার জিজ্ঞাসিত মহান বীর পুরুষ।”

সেনাপতি সা’দ যুবাইরকে অনুরোধ করলেন তাঁর ঘোষিত উপহার গ্রহণ করার জন্য।

যুবাইর উঠে দাঁড়িয়ে অবনত মস্তকে বললেন, “জাগতিক কোন লাভের আশায় আমি যুদ্ধ করিনি।

যদি কোন পুরস্কার আমার প্রাপ্য হয় তাহলে আমাকে পুরস্কৃত করার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।——-*****——–


আরও পড়ুনঃ

ইসলামিক বিভিন্ন ভিডিও দেখুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল-এ 👇👇👇

আরও পড়ুন

আপনার মতামত জানান